*.* উত্তরণের কৃতি সংবর্ধনায় ড. হাসান মোহাম্মদ *.* সন্দ্বীপে বিদ্যুতের সমস্যা ও সম্ভাবনা *.* সন্দ্বীপ-উড়িরচর ক্রসড্যাম প্রকল্প বাতিল হয়ে গেলো *.* সন্দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শিশুপার্ক ও আধুনিক সুযোগ সুবিধাসহ কিন্ডারগার্টেন *.* উত্তরণের ৩য় পাঠচক্র ও ঈদ পুনর্মিলনী ৩০ নভেম্বর বিকেল ৪ টায় *.* উত্তরণ পাঠচক্রের দ্বিতীয় বিষয়ঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস(প্রাচীন ও মধ্যযুগ) *.* উত্তরণ পাঠচক্রের প্রথম বিষয়ঃলং ওয়াক টু ফ্রিডম *.* উত্তরণের ঈদ পুনর্মিলনী ২০০৯ অনুষ্ঠিত *.* বিশেষ প্রতিবেদনঃ জেগে উঠছে সন্দ্বীপ *.* সন্দ্বীপের এইচ.এস.সি পরীক্ষার ফলাফল *.* উত্তরণের অগ্রগতি প্রতিবেদন *.* আমাদের ই-মেল: uttaransandwip@yahoo.com

সন্দ্বীপের স্মরণীয় ওলামা-মাশায়েখ আলেখ্য

-মাওলানা আবূবকর মুহাম্মদ সিদ্দীকূল্লাহ

সন্দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ভূখণ্ড। তিন হাজার বছরের অধিক প্রাচীন এ দ্বীপটি আদিকালের শ্রীশে, ইসলামী যুগের সমন্দর, পরবতীতে শুনদ্বীপ, সোমদ্বীপ, চন্দ্রদ্বীপ ইত্যাদি নামের বহু পরিবর্তন ও বিবর্তনের শেষ পরিণতিতে এর বর্তমান নাম হচ্ছে সন্দ্বীপ।

অবস্থানগত সুবিধার করণে সন্দ্বীপ বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। ইসলামের আবিভাবের অব্যবহিত পরবর্তীকালেই আরবীয় বণিকদের সঙ্গে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচারে নিয়োজিত মুবাল্লিগ ও মাশায়েখগণের আবির্ভাব ঘটে সন্দ্বীপ ও অন্যান্য উপকুলীয় অঞ্চলে। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর (১২০১ মতান্তরে ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে) বঙ্গ বিজয়ের বহুপূর্বে বহু মুসলমান সাধক, মুবাল্লিগও ওলামা-মাশায়েখ ইসলামের পতাকা বহন করে সন্দ্বীপে শুভাগমন করেছিলেন। এখানকার জলবায়ু , প্রাকৃতিক পরিবেশ, বসবাস ও জীবন ধারণের প্রযোজনীয় সামগ্রীর প্রাচুর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক মুবাল্লিগ, ওলামা-মাশায়েখ ও অলি-আউলিয়া সন্দ্বীপে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেন। এভাবে এ দ্বীপের অধিবাসীগণ আরব তথা মুসলিম সাধকের সংস্পর্শে এসে ইসলাম ধর্ম ও সভ্যতার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।

সন্দ্বীপের স্মরণীয় বরণীয় অলী আউলিয়া ও ওলামা-মাশায়েখ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতে হলে একটি সুবৃহৎ গ্রন্থ রচনা আবশ্যক হবে। এ ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভব নয় বলে এখানে কেবল সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী খ্যাতনামা ওলামা-মাশায়েখদের জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীন (রহঃ)

মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীন (রহঃ) বাগদাদ নিবাসী সৈয়দ আলফা হোসাইনির বংশধর ছিলেন। তিনি শাহাজাহানাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করে। কাজী-উল-কোজ্জাত আব্দুল ওয়াহহাব এবং কাজী মুহাম্মদ সালেহর আনুকুল্যে তিনি বাদশাহ আলমগীরের সহিত পরিচিত হন। তিনি বাদশাহ আলমগীরের সনদপ্রাপ্ত জায়গিরদার ছিলেন। চট্টগ্রামে কাজী সগীর, কাজী আবদুল্লাহ এবং সন্দ্বীপের মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীন ব্যতীত তখন ইসলামবাদে অপর কোন সনদপ্রাপ্ত জায়গীরদার ছিলেন না। এঁরা সকলেই ছিলেন কাদ্বী এবং বাদশাহী আমলে হাই কোর্টের জজ । এঁদের মধ্যে মোল্লা মুঈনুদ্দীন সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করেন। বাদশাহ আলমগীর মীর মুঈনুদ্দীনকে একখানা লা-খেরাজ জায়গীরদারীর তাম্র খোদিত সনদ প্রদান করেন।

মীর মুঈনুদ্দীন এর মূল বাড়ী ছিল হরিশপুর চারি আনি হাটের উত্তরে দুবলাপাড় গ্রামে। মেঘনার ভাঙ্গনে উক্ত বাড়িসহ গ্রামটি আংশিক বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁর বংশধরেরা সন্দ্বীপ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছেন। চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আলেম মীর ইয়াহইয়ার পিতামহ সৈয়দ আব্দুল গণি মীর মুঈনুদ্দীনের অধঃস্তন পুরুষ ছিলেন। ‘আহাদীছুল খাওয়ানীন’ এর লেখক নবাব হামীদুল্লাহ খানও মাতৃকুলের দিকে থেকে মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীনের বংশধর ছিলেন।

মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীন এর পুত্রের নাম মীর আমিন উদ্দীন কাজী। মীর আমিন উদ্দীনের পুত্রের নাম তফসীর কাজী। মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীন আরব, তুরস্কসহ বহু দেশ ভ্রমণ করেন। তাঁর বাড়ীর সামনেই তাঁর পাকা কবর ছিলো। লোকের মুখে শোনা যায়, তাঁর বাড়ীর সামনে একটি আরবী বিশ্ববিদ্যালয় আবার কারো মতে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন।

মোল্লা মীর মুঈনুদ্দীনের বংশে তাঁর মতো মর্যাদা সম্পন্ন  ও শিক্ষিত ব্যক্তি আর কেউ ছিলো না। এমনকি তাঁর কাছাকাছিও কেউ পৌছতে পারেননি। তাঁর অনেক বংশধর এখনো জীবিত আছেন। মীর মুঈনুদ্দীন ব্যতীত সম্রাট আলমগীরের খাস সনদপ্রাপ্ত জায়গীরদার আমাদের জানামতে পরগণা সন্দ্বীপে আর কেউ ছিলোনা।

আল্লামা রমীযুদ্দীন (রহঃ)

আল্লামা রমীযুদ্দীন (রহ) এর মূল বাড়ী ছিল বাউরিয়া গ্রামে । বৈবাহিক সূত্রে তিনি মুছাপুরের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে বসবাস করতেন। তিনি কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ও বড় মাপের অলিআল্লাহ ছিলেন। হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ বেলেভী (রহঃ) এর দু’খলিফা যথাক্রমে মাওলানা ইমাযুদ্দীন এবং মাওলানা কারামত জৌনপুরীর (রহঃ) তিনি আধ্যত্মিক শিষ্য ও খলিফা ছিলেন। কলকাতা আলীয়া ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক অধ্যাপক মাওলানা সুলতান মাহমুদের বর্ণনানুসারে, একদা জৌনপুরী (রহঃ) তাঁর সঙ্গে মোলাকাতের উদ্দেশ্য গমনকালে তাঁর বাসস্থানের আধা মইল দুরে থাকতে পাল্কি হতে অবতরণ করে হেঁটে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মুছাপুরে অবস্থিত পবিত্র মাযার আজও তাঁর অমর স্মৃতির উজ্জ্বল স্মৃতি বহন করছে।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, সন্দ্বীপের ইতিহাসে ওলামা মাশায়েখের স্মৃতিচারণ করলে রমীযুদ্দীন নামে সন্দ্বীপের দুজন বড় আলেম ও বুজুর্গ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায় । তাঁদের একজন উপরোল্লিখিত আল্লামা রমীযুদ্দীন । তিনি সমাজে বুড়ো রমীযুদ্দীন নামে পরিচিত ছিলেন।

এছাড়াও মৌলানার ‘পোলা রমীযুদ্দীন’ নামে আরো একজন খ্যাতনামা আলেম ছিলেন । তাঁর জন্ম নিবাস ছিল দক্ষিণ সন্দ্বীপে । তিনি একজন প্রখ্যাত অলীআল্লাহ ছিলেন। ইসলামী জ্ঞানে তাঁর পান্ডিত্যের এত বেশী গভীরতা ছিল যে লোকে তাঁকে বিদ্যাসাগর বলে সম্বোধন করতো।

এ ক্ষেত্রে দু’জন অলিআল্লাহ ও আলেমেদ্বীনের একজন খ্যাতনামা উস্তাদের উল্লেখ করতেই হয় । তাঁর নাম মাওলানা বাছীরুদ্দীন । সন্দ্বীপে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা হতে ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে মুতাবেক ১২৬৪ হিজরীতে সব্বোর্চ্চ ডিগ্রী লাভ করার পর উক্ত মাদ্রাসায় ৮/১০ বছর অধ্যাপনা করেন। অতঃপর সন্দ্বীপের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে তিনি সন্দ্বীপে ফিরে আসেন।

মাওলানা আব্দুল করিম (রহঃ)

মাওলানা আব্দুল করীম ইবনে মুহাম্মদ কামিল শাহ ১২৫৭ হিজরী সালে সন্দ্বীপের অন্তর্গত অধুনালুপ্ত ‘সিদ্ধি’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা কাজী হাসান আলীর নিকট উচ্চ মাধ্যমিক মান পর্যন্ত সন্দ্বীপেই লেখাপড়া করেন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। কলকাতা আলিয়া হতে বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি স্বর্ণপদক ও বৃত্তিলাভ করেন। অতঃপর সে মাদ্রাসা হতেই কৃতিত্বের সঙ্গে ফাযিল পাস করেন। এরপর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মুহাম্মদ হোসাইন এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তিনি সিহাহ সিত্তার পাঠ সমাপ্ত করেন। মাওলানা আব্দুল করীম মাওলানা আব্দুল হাদী ইসলামবাদীর আধ্যাত্মিক শিষ্য ছিলেন। কালে তিনি প্রখ্যাত অলীয়ে- কামিল ও অত্যন্ত বুজুর্গ ব্যক্তি হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন। তিনি ১৩১৭ হিজরী সালে ইন্তেকাল করেন।

আল্লামা অজীউল্লাহ (রহঃ)

সন্দ্বীপের আলেমকুল শিরোমণি মাওলান মুহাম্মদ অজীউল্লাহ (রহঃ) ১২৭৯ হিজরী সালে ইজ্জতপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মৌলভী জিন্নাত আলী। তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর আরবী ও ইসলামিয়াতে উচ্ছ শিক্ষা লাভের জন্য ভারতের প্রখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় গমন করেন। দীর্ঘ ১১ বছর যাবৎ তিনি দেওবন্দে কুরআন, হাদীস , ফিকাহ, উসূল তথা ইলমে মানকূলাত ও মাকূলাতের সকল বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী। একবার কোন কিছু শুনলে বা অধ্যয়ন করলে তিনি তা আর বিস্মৃত হতেন না । মেধা ও স্মৃতির তেজস্বীতা দেখে দেওবন্দে তাকে ‘জ্বিনকা বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করা হতো। জগতবিখ্যাত শায়খুল হাদীছ আলামা আনওয়ার শাহ কাশমীরী (রহঃ) তার সহপাঠী ছিলেন। কিন্তু সকল পরক্ষিায় অজীউলাহ (রহঃ) প্রথম আর আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী দ্বিতীয় স্থান লাভ করতেন। তার অতুলনীয় মেধা, অনুপম স্মৃতিশক্তি অদম্য সাহসিকতা এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ দেওবন্দে তাঁকে শেরে বাংলা উপাধিতে ভুষিত করা হয়। তিনি ছিলেন একজন সুবক্তা, প্রখ্যাত ওয়ায়েজ ও অত্যন্ত সাহসী আলেমে দ্বীন। ছিলেন স্বভাব কবি, সুক্ষ্ম ধর্মতাত্বিক , একজন সমাজনীতি বিশারদ । আল্লামা অজীউল্লাহ (রাহঃ) ছিলেন একজন ধর্মীয় সংস্কারক। তিনি আজীবন ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে অজ্ঞ মুসলিম সমাজকে হিদায়েতের পথে আহবান করে গেছেন। সন্দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী বশিরিয়া মাদ্রাসার তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। শত শত ছাত্রের মধ্যে মাওলানা মুসা সাহেব ছিলেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র । গ্রন্থ রচনায় তাঁর হাত ছিল । তার রচিত আনেক পুস্তক পুস্তিকার মধ্যে তাজবীজুল হাসানাত ফী জাওয়ায়েখিল খায়রাত এবং মুনাজারায়ে ফেনী’ নামক প্রকাশিত দুটি গ্রন্থ অন্যতম। তাঁর রচিত অকেন পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।এবং কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে। মাওলানা আব্দুল আউয়াল জৌনপুরী (রহঃ) সন্দ্বীপের কৃতী সন্তানদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আরবী ভাষায় আল মাজলাতুল আদীব-রি আজলাতি সন্দ্বীপ, নামক একখানা গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে তিনি আলামা অজীউল্লাহের (রহঃ)ভূয়সী প্রশংসা করেরছেন। অবশেষে সন্দ্বীপের এ অনন্যসাধারণ আলেম ১৯৩১ সালে ইন্তেকাল করেন এবং নিজ গ্রামের বাড়িতে সমাধিস্থ হন। তাঁর পবিত্র কবরটি বর্তমানে মেঘনার ভাঙ্গনে শিকার হয়ে সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

মাওলানা গোলাম খালেক (রহঃ)

মাওলানা গোলাম খালেক লোক সমাজে মৌলভী গোলাম খালেক নামে বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর পিতার নাম আহমদ আলী । উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তিনি কুচিয়ামোড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তথা হতে সব্বোর্চ্চ ডিগ্রী লাভ করে তিনি উক্ত মাদ্রাসায় অধ্যাপক নিযুক্ত হন। শিক্ষা জীবনের সকল স্তরে প্রথম বিভাগ লাভ করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। কিছুকাল অধ্যাপনা করার পর তিনি স্বগৃহে ফিরে আসেন। পিতৃপ্রদত্ত অগাধ সম্পত্তি ও ধন দৌলতের মালিক হয়ে তিনি সারা জীবন রাজকীয় হালে অতিবাহিত করেন। তার রাজকীয় চাল চলনের জন্য তিনি “প্রিন্স আব দি আইল্যান্ড” নামেও খ্যাত ছিলেন। তিনি সন্দ্বীপের প্রথম ব্যক্তি যিনি বাড়ীতে ইটের দালান নির্মাণ করেন। আজীবন তিনি সমাজ সেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। সন্দ্বীপ টাউন হল, অধুনালুপ্ত চ্যারিট্যাবল ডিসপ্যানসারী এবং কার্গিল হাই স্কুলের জন্য তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্রদের জন্য তাঁর প্রদত্ত টাকা হতে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা বহুকাল পর্যন্ত চালু ছিল। তার বাড়ির সম্মূখে বাজার ও স্কুল তাঁরই কীর্তি । সন্দ্বীপে কর্মজীবনে পদার্পণের পর হতে মাত্র একবার ব্যতীত জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে জুন মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা আহমদ খাঁ (রহঃ)

আহমদ খাঁর পূর্বপুরুষ ভারতের মুরাদাবাদ হতে বরিশাল জেলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম কানুন খা। কেরামত আলী জৌনপুরীর (রহঃ) খলীফা মাওলানা দরবেশ আলীর সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে তিনি সন্দ্বীপে এসেছিলেন। বিশিষ্ট অলী দরবেশ আলী সাহেবের পরিপ্রেক্ষনায় আহমদ খাঁ সাহেব যোগ্য আলেমে দ্বীন এবং কালের সেরা অলীআল্লাহর মর্যাদা হাসিল করেন। ১০৫ বছর বয়সে রহমতপুরের নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং তথায় সমাহিত হন। তঁর কবরটি কিছুকাল পূর্বে মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে।

মাওলানা সাঈদ আহমদ (রহঃ)

মাওলানা সাঈদ আহমদ (রহঃ) ১৩০০ হিজরী মুতাবেক ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দে সন্দ্বীপের কালাপানিয়ায় জন্মগ্রহণ করনে। তাঁর পিতার নাম মুন্সী নুর বখশ, কারো মতে তাঁর পিতার নাম মুন্সী নুরুল হক। তাঁর পিতা কালাপানিয়া গ্রামের খুরশিদ আলম চৌধুরীর জমিদারী দেখাশোনা করতেন। মাওলানা সাহেবের মাতার নাম মাজেদা খাতুন। তিনি ছিলেন একজন মহিয়সী নারী। তিনি সবসময় ইবাদত বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন।

মাওলানা সাঈদ আহমদ প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা তাঁর পিতার নিকট সমাপ্ত করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে উচ্চ শিক্ষার লাভের উদ্দেশ্য তিনি ভারতের দারুর উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় গমন করেন। দেওবন্দ দীর্ঘ ১১ বছর লেখাপড়া করার পর দাওরায়ে হাদিছ তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৩২২ হিজরী সারল নিজ বাড়ী ফিরে আসেন এবং ১৩২৩ হিজরীতে হাটহাজারী মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় শিক্ষক নিযুক্ত হন । ১৩৬১ হিজরী পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩৫/৩৬ বছর যাবৎ তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা এবং প্রধান মুহাদ্দিছের দায়িত্ব পালন করেন। পরবতীকালে প্রধানতঃ তাঁর উদ্যেগে প্রতিষ্ঠিত চারিয়া কাসিমূল উলুম মাদ্রাসার তিনি ছিলেন মুহতামিম। দেওবন্দ থাকাকালে ছাত্রজীবনেই তিনি প্রথম হযরত মাওলানা গাংগুহীর (রহঃ) নিকট তরীকতের সবক নেন। তাঁর হিদায়ত মত পরবতীতে মাওলানা জমীরদ্দীন (রহঃ) এর নিকট হতে খিলাফত প্রাপ্ত হন। ১৩৭৫ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মাদ্রাসা চারিয়ার পাশেই তাঁর কবর অবস্থিত।

মাওলানা মুছা (রহঃ)

মাওলানা মুছা (রহঃ) ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে আমীরাবাদে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী ওয়াইজুদ্দীন । তিনি যুগের দু’ শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা অজীউলাহ (রহঃ) ও মাওলানা আতাউর রহমানের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা গমন করেন। কোরআন, হাদীস, তফসীরসহ যাবতীয় বিষয়ের ওপর সর্বোচ্চ সনদ হাসিল করার পর তিনি দেশে ফিরে এসে আজীবন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সন্দ্বীপের বশিরিয়া আহমদিয়া মাদ্রাসা, ঢাকার আহসানিয়া মাদ্রাসা ও ভোলা সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯২২ হতে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কারামতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা নোয়াখালী এর অধ্যক্ষ পদে এবং অতঃপর ১৯৩৬ সাল হতে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত বশিরিয়া আহমদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সন্দ্বীপে সর্বপ্রথম দাখিল,আলিম ও ফাযিল পরীক্ষার কেন্দ্র মঞ্জুর হয়।

মাওলানা মুসা শুধু একজন খ্যাতনামা আলেম ও শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেশ ও জাতির সেবা করেন। বৃটিশ খেদাও আন্দোলন ও ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দের খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দান করার কারণে বৃটিশ সরকারের নির্দেশে তিনি ছয় মাস কারাবরণ করেন। দেশ ও জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে মাওলানা মুসাই সন্দ্বীপের প্রথম কারাভোগী ব্যাক্তিত্ব ও নেতা । ১৯২৫ সালে আঞ্জুমানে ওলামার তৃতীয় অধিবেশনে প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করে তিনি যে সারগর্ভ বক্তৃতা দেন তা সর্বজন স্বীকৃত ও সমাদৃত হয়। মাওলানা মুসা অনেকগুলো মুল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তোহফাতুল মোবতাদী, আদুররুল মুফাদ্বিল ফীশরহিল মুফাসিসল নামক প্রকাশিত দুখানা কিতাব তাঁর প্রকাশনা কর্মের স্বাক্ষর বহন করছে। মাওলানা মুসা (রহঃ) ১৯৫৫ সালে ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

অধ্যক্ষ মাওলানা জিয়াউল হক (রহঃ)

মাওলানা জিয়াউল হক ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে মুহাম্মদপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মুন্সি আমানত আলী। তিনি ফাজিল পাস করার পর মেট্রিকুলেশন ও ইন্টারমিডিয়েট সনদ লাভ করে । অতঃপর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় আরবী ও ফার্সী ভাষার ওপর ডাবল এম.এ এর সনদ লাভ করেন। ফার্সীতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করছিলেন। শিক্ষা জীবন শেষ করার পর তিনি অধ্যপনার পেশা ইখতিয়ার করেন। বহু কলেজ ও মাদ্রাসায় অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করার পর অবশেষে ১৯৪৩ হতে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল দায়িত্ব পালন করার গৌরব অর্জন করেন । তিনি কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার ৩৩ তম ও মুসলমানদের মধ্যে পঞ্চম অধ্যক্ষ । আরবী ও ফার্সী ভাষায় তিনি কয়েকখানা পুস্তক রচনা করেন। আল-মকতাতাফ তার খ্যাতনামা আরবী পত্র সংকলন। ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে খান সাহেব এবং ১৯৪৩ সালে খান বাহাদুর উপাধিতে ভুষিত করেন। জিয়াউল হক খান কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগজেকিউটিভ কাউন্সিল ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। অবশেষে ১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দে এ মহান শিক্ষাবিদ ঢাকায় পরলোক গমন করেন।

মাওলানা নুরুল্লাহ (রহঃ)

আবুল আলা মুহাম্মদ নুরুল্লাহ (রহঃ) ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে মুছাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বশিরিয়া আহমদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার পাঠ শেষ করে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ভর্তি হন। ১৯১৮ খ্রীস্টাব্দে উক্ত মাদ্রাসা হতে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি ফখরুল মুহাদ্দিসীন ডিগ্রী হাসিল করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। মেধা ও যোগ্যতা বলে তিনি কলকাতা আলিয়ার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। বিখ্যাত আলিম ও সুফীসাধক মাওলানা সফীউল্লাহর  (রহঃ) তিনি শিষ্য ছিলেন। মাওলানা নুরুল্লাহ কলিকাতাস্থ নোয়াখালী মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকবছর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৫১ সালে মাওলানা নুরুল্লাহ ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান (রহঃ)

শেরে বাংলা আল্লামা অজীউল্লাহর (রহঃ) সুযোগ্য জ্যেষ্ঠপুত্র মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান পিতার ন্যায় অত্যন্ত মেধাবী ও তেজস্বী আলেম ছিলেন। তিনি বহু বছর সন্দ্বীপ হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। খেলাফত,অসহযোগ ও পাকিস্তান আন্দোলন তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৫৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা আবদুল্লাহ (রহঃ)

মাওলানা আব্দুল্লাহ (রহঃ) ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে সারিকাইত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিখ্যাত সূফী আল্লামা সফীউল্লাহর খলীফা ছিলেন। তিনি ছিলেন সন্দ্বীপ দারুল উলুম মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা খবীরুল হক (রহঃ)

মাওলানা খবীরুল হক কাজিরখিল গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা হতে সর্বোচ্চ দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে কাজিরখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং একাধারে ৪০ বছর যাবৎ এ মাদ্রাসার মুহতামিম ছিলেন।

মাওলানা খুরশীদুল আলম (রহঃ)

মাওলানা খুরশীদুল আলম (রহঃ) এর বাড়ী ছিল হরিশপুর গ্রামে । তিনি ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসা হতে সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর তিনি শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস ছিলেন। সত্তরের দশকে তিনি ইন্তেকাল করেন।

মৌলানা আব্দুল মালেক খান (রহঃ)

অলীয়ে কামিল মাওলানা আহমদ খার জ্যেষ্ঠ পুত্র মাওলানা আব্দুল মালেক খান ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলায় সরকারী পাঠ্য তালিকায় পরিচালিত মাদ্রাসা হতে সবোর্চচ ডিগ্রী লাভ করেন। অত্যন্ত মেধাবী ও ধীশক্তির অধিকারী মাওলানা আব্দুল মালেক খান আরবী, ফার্সী, উর্দ্দু , ইংরেজী ও বাংলা ভাষায় অত্যন্ত সুপণ্ডিত ছিলেন ও সব ভাষাতেই অনর্গল বক্তৃতা করতে পারতেন। লেখাপড়া শেষ করে আব্দুল মালেক খান শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি চট্টগ্রামের মুসলিম হাই স্কুল, ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও সন্দ্বীপ কার্গল হাই স্কুলের এ্যাংলো এরাবিক শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া তিনি কাটগড় ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, বশিরিয়া আহমদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা এবং চট্টগ্রামের গহিরা মাদ্রাসার সুপারিন্টেনডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জীবনের শেষ দিকে চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় কয়েক বছর মুফতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বুলবুল ছদ্মনামে লিখতেন বিধায় তাকে বুলবুলে বাংলা বলা হতো। ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে ও স্বাধীনতা আন্দোলনের তিনি ছিলেন জোরালো প্রবক্তা। প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করেন। মাওলানা আব্দুল মালেক খান ১৯৬৬ সালে ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা আব্দুল ওয়াদূদ (রহঃ)

মাওলানা আব্দুল ওয়াদূদ আনুমানিক ১৩০৫ হিজরী মুতাবেক ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে চর রহিম নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গাজী সূফী আফসারুদ্দীন সরদার। গ্রামের বাড়িতেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়। অতঃপর ১৩৯১ সালে তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে হিদায়া কিতাব পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তারপর ভারতের প্রখ্যাত দারুর উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ হাদীছ , তাফসীর সহ ইলমে মানকুলাত ওমা কুলাতের সকল বিষয় অধ্যয়ন করে যোগ্য আলেম হন। তিনি প্রসিদ্ধ ক্বারী আব্দুল ওয়াহদি এর নিকট ইলমে তাজবীদ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি হাকীমুল উম্মাহ হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর (রহঃ) এর খিলাফত হাসিল করেন। ১৩২৭ হিজরী সালে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। সে বছরই তিনি দঃ চট্টগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান জীরী মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পদে নিয়োজিত হন। ১৩২৭ হিজরী হতে ১৩৮৮ হিজরী পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৬০/৬১ বছর যাবৎ উক্ত মাদ্রাসায় তিনি হাদীস,তাফসীরসহ ইলমে দ্বীনের অন্যন্য গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে অধ্যাপনায় রত ছিলেন। তিনি ছিলেন শায়খুল হাদিস,বড় মর্তবার আলেমে দ্বীন ও একজন কামিল অলীআল্লাহ । পটিয়ায় মুফতী আজিজুল হক এবং জীরীর মুফতি নুরল তারই সুযোগ্য ছাত্র। অবশেষে সন্দ্বীপের এ মহান খ্যাতনামা আলেম ১৩৮৮ হিজরী মুতাবেক ১৩৭৪ বাংলা মুতাবেক ১৯৬৮ সালে সোমবার দিবসে ইন্তেকাল করেন। দক্ষিণ সন্দ্বীপ সাতঘরিয়া গ্রামে তাঁর নিজস্ব বাড়ির সম্মুখস্থ মসজিদে সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মাওলানা ক্বারী মুহাম্মদ আব্দুল মালেক (রহঃ)

মাওলানা ক্বারী মুহাম্মদ আব্দুল মালেক (রহঃ) আনুমানিক ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দে মুতাবেক ১৩২৩ হিজরী কালাপানিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলহাজ্ব মুন্সি মীর আব্দুল লতীফ । কথিত আছে যে, তাঁর পূর্বে পুরুষের মধ্যে সৈয়দ হাশিম নামে জনৈক খ্যাতিনামা ব্যক্তি মধ্য এশিয়ায় কোন অঞ্চলে হতে সন্দ্বীপে বসতি স্থাপন করেন। ক্বারী আব্দুল মালেক কাটগড় মাদ্রাসা হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে নোয়াখালী কারামতিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে উক্ত মাদ্রাসা হতে সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করেন। দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ কাটগড় ইসলামীয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষকতা করেন। পরিণত বয়সে তিনি নোয়াখালীর প্রখ্যাত ক্বারী মাওলানা ওবায়দুলাহ এর নিকট ইলমুল কিরাত বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে একজন উঁচুমানের ক্বারী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তিনি কারামত আলী জৌনপুরীর (রহঃ) পৌত্র মাওলানা হাফেজ আব্দুর রব এর নিকট আধ্যাত্মিক সবক গ্রহণ করে তাঁর খেলাফত লাভ করেন। অবশেষে তিনি ১৯৬৮ খ্রীষ্টাব্দে মুতাবেক ১৩৭৪ বাংলা মুতাবেক ১৩৮৮ হিজরী ৯ই মুহরম রোজ রোববার ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা মুদাসসির আহমদ (রহঃ)

মাওলানা মুদাসিসির আহমদ (দায়ম) মুন্সি নুর এর দ্বিতীয় পুত্র এবং মাওলানা সাইদ আহমদ এর ছোট ভাই । তিনি দরসে নিজামী অনুসারে দাওরায়ে হাদীছের সর্বোচ্চ ডিগ্রী হাসিল করেন। অতঃপর কালাপানিয়ার পশ্চিম দক্ষিণ এলাকায় হিদায়াতুল ইসলাম প্রকাশ কালাপানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে আজীবন উক্ত মাদ্রাসার মুহতামিম হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এখনও মাদ্রাসাটি তাঁর কৃতিত্বের স্মৃতি বহন করছে।

মাওলানা সৈয়দ আহমদ (রহঃ)

মাওলানা সৈয়দ আহমদ দক্ষিন সন্দ্বীপ নিবাসী একজন প্রথিযশা আলেমে দ্বীন ও মুবাল্লিগে ইসলাম ছিলেন। তিনি আনুমানিক ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন্ । প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। দীর্ঘ ৮/১০ বছর অধ্যয়ন করে তিনি উক্ত মাদ্রাসা হতে হাদীছ, তাফসীর তথা ইলমে মানকুলাতও মাকুলাতের যাবতীয় বিষয়ে জ্ঞান হাসিল করেন। তিনি ছিলেন আল্লামা হোসাইন আহমদ এর সহচর। লেখাপড়া শেষ করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বরিশালের শর্শিনা মাদ্রাসা এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় অধ্যপনা করেন। তিনি আরবী ভাষায় সুপণ্ডিত , খুবই সাহসী আলেম,সুবক্তা এবং একজন সুলেখক ছিলেন। ভারতের  স্বাধীনতা বিশ্ব মুসলিমের শান্তি এবং কোরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে নারী তার রচিত পুস্তকের অন্যতম । অবশেষে প্রায় ৯০ বছর বয়সে তিনি ১৯৮৯ খ্রীষ্টাব্দে অক্টোবরের ৩১ তারিখ ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহঃ)

মাওলানা শাসসুদ্দীন কাসেমী (রহঃ) ছিলেন একজন খ্যাতনামা আলেমে দ্বীন । সন্দ্বীপে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা ভর্তি হন এবং তথা হতে দাওয়ায়ে হাদীসের সনদ লাভ করেন। মাওলানা শামসুদ্দিন প্রথমে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর নাম পরিবর্তন করে জামিয়তে ওলামায়ে ইসলাম পয়ায়ে তিনি ঢাকা মীরপুরে জামেয়া হোসাইনিয়া নামক একখানা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক বছর পূর্বে তাঁর ইন্তেকাল হয়।

মাওলানা হাফেজ আব্দুল মালেক (রহঃ)

১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে সন্দ্বীপের চরদুতে মাওলানা হাফেজ আব্দুল মালেকের জন্ম হয় । তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ মোবারক আলী। তিনি চরবদুর খ্যাতনামা হাফেজ মাওলানা মুখলেসুর রহমানের নিকট মাত্র দশ বছর বয়সে পুর্ণ কোরআন শরীফ হিফজ করেন। অতঃপর তাঁর নিকট দ্বীনী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। হাফেজ আব্দুল মালেক নিয়মিতভাবে সন্দ্বীপের কাটগড় মাদ্রাসা, নোয়াখালী কারামতিয়া মাদ্রাসা এবং ঢাকার আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যয়ন করে র্স্বোচ্চ এম,এম,ও এম,এফ, ডিগ্রী লাভ করেন। এম,এফ ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অতঃপর করাচী ইসলামিক ইউনিভাসিটি হতে তিনি এম.এ.ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি মদীনা ইউনিভার্সিটি হতে তিনি এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি মদিনা ইউনিভার্সিটি হতে ইসলামিয়াতের সর্বোচ্চ সনদ হাসিল করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান দেওয়া অধিকার করেন। অতঃপর তাঁকে তথায় শিক্ষকতার নিমিত্ত নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু সন্দ্বীপের মায়াজাল তাঁকে বিদেশে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। সন্দ্বীপ কারামতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা,কাটগড় সীনিয়র মাদ্রাসা এবং বশিরিয়া আহমদিয়া সীনিয়র মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন যাবত তিনি অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও আপ্রাণ প্রচেষ্টায় বশিরিয়া আহমদিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হন। তিনি সন্দ্বীপ টাউন বাজার মসজিদে আজীবন খতীব ছিলেন। তিনি লিবিয়া সরকারের পক্ষ হতে ধর্মীয় মুবাল্লিগের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সন্দীপে নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি ছিলেন । গবেষণা ও প্রকাশনায় তাঁর যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি ছিল। খ্রীষ্টান ও কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে কলমের তলোয়ার মানবধর্ম ইসলাম, ফায়সালায়ে মীলাদ ও ক্বিয়াম, পাচ তরীকার অজীফা, গফুরী মারিফাত ভাণ্ডার ইত্যাদি পুস্তক তাঁর রচিত অমর কীর্তি। আধ্যাত্মিক দিক থেকে প্রথমে মাওলানা মুফতী আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদীর নিকট সবক গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁরই অনুমতিক্রমে মদীনার বাসিন্দা মাওলানা আব্দুল গফুর মাদানীর খিলাফত লাভ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে ইন্তেকাল করেন।

সন্দ্বীপ আবহমান কাল থেকে ওলামা মাশায়েখও অলী-আওলিয়ার কেন্দ্র । উপসংহারে মনে পড়ে সে সব ওলামাকে যাদের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তের অভাবে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তাদের শুধু নাম সংযোজন করে আমি এ আলোচনা ইতি টানতে চাই।

ক) দুর অতীতের কতিপয় ওলামা মাশায়েখের নাম।

সর্বজনাব মাওলানা আবুল হাকাম আহমদ,আব্দুল জব্বার, আব্দুল মজিদ, আব্দুল বারী , ফজলুর রহমান , লূৎফুর রহমান, মুহাম্মদ মাসউদ, আবুল হোসাইন, হাবীবউলাহ, নুর আহমদ, অলিউলাহ, আফাজুদ্দীন, অহিদুর রহমান, আব্দুল গনি, তাফাজ্জেল বারী, আব্দুল হক , নিজামউদ্দীন , আব্দুল লতীফ, আব্দুর রশীদ, আব্দুর হামীদ, আব্বাস আলী প্রমুখ।

খ) নিকট অতীতের কতিপয় ওলামা মাশায়েখের নাম।

কাজী হাসান আলী, মৌলভী বশীরুলাহ, মাওলানা খোরশিদ আলম, (সরিকাইত) মাওলানা খোরশিদ আলম(কাটগড়)মাওলানা ইসমাইল, মাওলানা ওমর আহমদ, মাওলানা মুরশিদুর রহমান, মাওলানা শফীকুর রহমান, মাওলানা সালেহ আহমদ, মাওলানা মুহাম্মদ মুফাজ্জল প্রমুখ।

মন্তব্য প্রদান করুন
This is a captcha-picture. It is used to prevent mass-access by robots. (see: www.captcha.net)
            কীবোর্ড: বিজয়    ইউনিজয়    ফনেটিক    ইংলিশ
ছবির লেখাটি প্রবেশ করুনঃ
নাম(*):
ই-মেইল:
মন্তব্য(*):
 
  • ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১২, সকাল ০৭:৩৮ মি: - জিন্নাহ্‌
  • আ্স্‌সালামুআলাইকুম।মাওলানা হাফোজ আব্দুল মালেক (রহঃ)আমার নানা।ঊনার ইন্তেকাল হয়েছে ১৯৮৯ সালে ১৯৭৯ সালে নয়। আশা করি সংশোধন করা হবে। ধন্যবাদ

  • ২৪ জুন ২০১২, ০৫:২৯ মি: - রিফাত
  • আমাকে কি কেউ 'ওলি আহমেদ সওদাগর&' সম্পর্কে কোনও তথ্য দিতে পারবেন? যে কোনও উৎস থেকে..তার বাড়ি ছিল হরিশপুর।

  • ২৪ জুন ২০১২, ০৫:২৩ মি: - রিফাত
  • আমাকে কি কেউ "ওলি আহমেদ সওদাগর" সম্পর্কে কোনও তথ্য দিতে পারবেন? যে কোনও উৎস থেকে............

  • ২৬ এপ্রিল ২০১২, সন্ধ্যা ০৭:৩১ মি: - jvpojhio
  • OYhyo3 , [url=http://yhnzafscgxws.com/]yhnzafscgxws[/url], [link=http://liupyjpyrucy.com/]liupyjpyrucy[/link], http://ivauuqsljafv.com/

  • ২৫ এপ্রিল ২০১২, সকাল ১০:৩৬ মি: - brtazs
  • tWMNNa <a href="http://soovwgyzaquf.com/">soovwgyzaquf</a>

  • ২৪ এপ্রিল ২০১২, রাত ০৯:৩২ মি: - Jose
  • Gee willierks, that's such a great post!

  • ১৬ মে ২০১০, রাত ০২:২১ মি: - Mohammad sharful azad
  • The details of union parishad is not complete.we should complete this.

© 2008 Uttaran. All right reserved. Developend by: Softvalley Ltd.
Privacy | Terms